রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

দুর্যোগ মোকাবেলায় তিন স্তরের বেষ্টনী

ভাসানচর। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা ১৩ হাজার একরের এই দ্বীপের ১ হাজার ৭০২ একর নিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘আশ্রয়ণ-৩’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

এরপরও রয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। একে কাজে লাগানোরও ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই দ্বীপ ও দ্বীপের মানুষদের সুরক্ষায় ১৭৬ বছরের আবহাওয়ার মডেলগুলো বিশ্লেষণ করে তৈরি হয়েছে তিন স্তরবিশিষ্ট বেষ্টনী।

প্রকল্প এলাকা ঘিরে ৯ ফুট উচ্চতার বেড়িবাঁধটি আরও উঁচু করে ১৯ ফুট করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চরের ভাঙন রোধে ও বেড়িবাঁধের সুরক্ষায় নেয়া হয়েছে তিন ধাপের সমন্বয়ে শোর প্রোটেকশন (তীর সুরক্ষা)।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাসানচরের আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের চারদিক ঘিরে ৮টি স্তরে কম্পেকশন সহকারে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধ থেকে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় করা হয়েছে ম্যানগ্রোভ বন।

তারপরই রয়েছে শোর প্রোটেকশন। এর প্রাথমিক স্তরে স্থাপন করা হয়েছে বুমসহ ‘ওয়েভ স্ক্রিন ব্রেক ওয়াটার’। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে পাথরের গ্র্যাভেল।

তৃতীয় স্তরে আছে জিও ব্যাগ। দ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে বাঁধের সমুদ্র তীরবর্তী অংশে ধীরগতির ভাঙন প্রতিরোধে ২.১ কিলোমিটার ওয়েভ স্ক্রিন পাইলিং, গ্র্যাভেল ও জিও ব্যাগের সমন্বয়ে এ শোর প্রোটেকশন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি বেড়িবাঁধ থেকে ৪০০-৫০০ মিটার দূরে স্থাপন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ভাসানচর আবাসন প্রকল্পের পরিচালক নৌবাহিনীর কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলা ও চর রক্ষায় ১৭৬ বছরের আবহাওয়ার মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বেড়িবাধের পরে ম্যানগ্রোভ বন এবং শোর প্রোটেকশন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্টাল এরিয়ার যে রুলস আছে সেটা মেনেই বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সম্পাদন হয়েছে।

কেবল এই প্রোটেকশন ব্যবস্থাতেই দুর্যোগের প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা এই চরে বিশ্বমানের সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। ১২০টি ক্লাস্টার হাউস নির্মাণ করা হয়েছে ভূমি থেকে ১৪ ফুট উঁচুতে।

প্রতিটি ক্লাস্টার হাউসের সঙ্গে রয়েছে একটি করে সাইক্লোন শেল্টার। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ১ হাজার করে ১২০টি শেল্টারে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়াও প্রতিটি সাইক্লোন শেল্টারের নিচ তলায় আশ্রয় নিতে পারবে ২শ’ করে গবাদিপশু। শেল্টারগুলো এমনভাবে স্টিল, কংক্রিট এবং কম্পোজিট স্ট্র্যাকচারে (কাঠামো) তৈরি যা সিডরের মতো শক্তিশালী ঝড়ও সহ্য করতে সক্ষম।

এ বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক কমোডর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রত্যেকটি শেল্টার গ্রাউন্ড লেভেল থেকে ১৪ ফিট উপরে। প্রতিটি শেল্টার ২৬০ কিলোমিটারের মতো বাতাসকে প্রতিহত করতে পারবে, সেভাবেই স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়েছে।

এসব ব্যবস্থার বাইরে ভাসানচর ও এর অধিবাসীর সুরক্ষায় নেয়া হয়েছে বহুমুখী ব্যবস্থা। এ বিষয়ে আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের উপ-পরিচালক কমান্ডার আনোয়ারুল কবির বলেন, আমরা সব ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা রেখেছি। বাঁধ শক্তিশালী করতে এর দু’দিকে ঘাস লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাঁধগুলোতে ১৮টি স্লুইসগেট থাকবে। গত বছর এই এলাকায় প্রায় এক লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। আরও ১০ লাখ গাছ লাগানোর উদ্যোগ রয়েছে। প্রথম প্রথম এখানে গাছ হতো না।

কিন্তু বাঁধ দেয়ায় লবণাক্ত পানি সেভাবে ঢুকতে পারছে না। মাটিতে থাকা লবণও বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে। এ জন্য তিন বছর ধরে ধান চাষও ভালো হচ্ছে। ২৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বন কর্মকর্তা বৃক্ষ রোপণে কাজ সহায়তা করছেন। চরটির সবুজায়নে সব ধরনের উদ্যোগ রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা ঝুঁকি বিবেচনায় চরটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ নানা মহল প্রশ্ন তুলেছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, তাদের তিন দশকের অভিজ্ঞতা বলছে- চরটি বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী এবং নিরাপদ। যখন কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না তখনই তারা এখানে এসেছেন।

কয়েকটি ঝড়ের মধ্যেও থেকেছেন। তখনই কোনো সমস্যা হয়নি। আর আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের পর কোনো সমস্যা হওয়ার সুযোগই নেই।

কথা হয় ভাসানচর প্রকল্পের বাইরে বসবাসরত নোয়াখালীর সুবর্ণচরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর ফকিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, বহু বছর আগে এই চরের নিচু এলাকাগুলোতে জোয়ারের পানি উঠত।

ঘণ্টাখানেক পর আবার নেমে যেত। এভাবে পলি জমতে জমতে বড় একটি একটি অংশ এখন পুরোপুরি নিরাপদ। কয়েকটি ঝর ও জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে আমি এখানে ছিলাম, কিছুই হয়নি।

তিনি বলেন, নোয়াখালী অঞ্চলে আমরা বলি যেখানে ‘উরির ঘাস’ (বিশেষ উদ্ভিদ) উঠেছে সেই জায়গা নিরাপদ। কোনো চরে এই ঘাস হলে সেটা আর ভাঙে না। এখানেও প্রাকৃতিকভাবে এই ঘাস হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ