মঙ্গলবার, ০৯ মার্চ ২০২১, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

যেভাবে পাচার হয় ইয়াবার কাঁচামাল

২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় ধরা পড়ে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল ‘সিউডোফিড্রিন’। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ১০টি কার্টনে ভরে এগুলো পাচার করা হয়েছিল। দেশটির কাস্টম নারকোটিকসের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এ ঘটনায় ঢাকায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়।

অভিযোগ পেয়ে পাচারের ঘটনা তদন্তে কমিটি করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ওই কমিটির প্রতিবেদনে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে ইয়াবা তৈরির কাঁচামালসহ মাদক পাচারের অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ দিয়ে কোন কৌশলে, বিমানবন্দরের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার হয়ে আসছিল তাদের নামও উঠে আসে। ইয়াবার কাঁচামাল পাচারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে কারা কীভাবে সিসিটিভির ফুটেজ গায়েব করেছে সে বিষয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে বিমানবন্দর দিয়ে মাদক পাচার ঠেকানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম রোধে ১৪টি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি বেবিচকের চেয়ারম্যানের দপ্তরে দেওয়া হয়।

কমিটির অন্যতম কয়েকটি সুপারিশ হলো স্ক্রিনিং ছাড়া বস্তাবন্দি প্যাকেট বা খাম কার্গোর ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। কার্গোতে কর্মরত কর্মচারীরা দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্তব্য পালন করছে। সময়ে সময়ে বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের ডিউটি পরিবর্তন করা হলে অনিয়ম অনেক হ্রাস করা সম্ভব। ইডিএস মেশিন অটোমেটিক অ্যালার্ম দিলে বিস্ফোরণ শনাক্ত করলে শুধু কার্টন খুলে দেখা হয়। এ মেশিনে সব ধরনের ইমেজ দেখার ব্যবস্থা না থাকলে মেডিসিন বা ড্রাগের মতো পণ্য যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। কার্গো ওয়ারহাউজ এবং বিল্ডআপ এরিয়ায় পর্যাপ্ত সিসিটিভি স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধি, ফুটেজের রেকর্ডিং কমপক্ষে ৩ মাস সংরক্ষণ করা। ওয়্যারহাউস এলাকায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের পণ্য এলাকাভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। স্ক্রিনিং লগ ও স্ক্রিনিং শিটে সময় ও স্বাক্ষর যথাযথভাবে মেইনটেইন হচ্ছে কিনা তদারকি করা।

সুপারিশে আরও বলা হয়, কার্গোতে নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মকর্তা (সাবেক) নাসিমা আক্তার ও ছায়েদুল হক ভূঁইয়া এবং এ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঠিক মনিটরিং এবং তত্ত্বাবধানে ঘাটতি রয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনিটরিং ও তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তৌহিদুল আহসান গত বুধবার আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিবেদন এখনো হাতে পাইনি। আমরা কার্গো ভিলেজে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সিসিটিভি ফুটেজের আওতায় আনা হয়েছে এবং হচ্ছে। পণ্যের আড়ালে যেন মাদক বা অন্য কোনো অবৈধ জিনিস পাচার না হয় সে লক্ষ্যে কর্তব্যরতদের সতর্ক করা হয়েছে। এর পরও কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় ইয়াবার কাঁচামাল পাচারের সঙ্গে যাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটে ১০ কার্টন ওষুধ যাওয়ার বিষয়টি বিমানবন্দরের দপ্তর জানার পর ৬নং মেশিনের সিসিটিভি ফুটেজ ও ইমেজ পরীক্ষা করে সাসপেকটেড আইটেমের অস্তিত্ব না পাওয়ায় তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে বিষয়টির রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি এবং এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ফুটেজ ও ইমেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

১০ কার্টনে ইয়াবার কাঁচামাল পাচারের বিষয়ে বলা হয়, কার্গোর ৪ নম্বর মেশিনে এয়ারওয়ে বিল নং-৪২২২৯৪১২-এর ১০ কার্টন মালামাল স্ক্রিনিং করার সময় সাদা মোড়কে আচ্ছাদিত পণ্যের সংখ্যা ১০ কার্টন উল্লেখ থাকলেও স্ক্রিনিংয়ের পর একই রকমের কার্টন/বস্তা ১৫টি পরিলক্ষিত হয়। ১০ কার্টনের মধ্যে ক্যুরিয়ার ডকুমেন্টসে অন্য কোনো আইটেমের অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ কৌশলে কুরিয়ার ডকুমেন্টসের ভেতরে সন্দেহজনক পণ্য বহন করা হয়েছে। ৪ নম্বর মেশিনে কথিত ১০ কার্টন পণ্য এসএম ওমর ফারুক, স.নি. প্রহরী কর্তৃক এয়ারওয়ে বিল-৪২২২৯৪১২ এর পণ্য ১১টা ৩৪ মিনিট থেকে ১১টা ৫৪ মিনিটের মধ্যে স্ক্রিনিং করা হয়। কিন্তু স্ক্রিনিং লগে সময় উল্লেখ করা হয় ১২টা ১৮ থেকে ১২টা ৩৮ মিনিট এবং স্ক্রিনিং শেষ হলে তাতে স্বাক্ষর করেন স.নি. প্রহরী (প্রয়াত) কামরুল ইসলাম।

যদিও যিনি স্ক্রিনিং করেন স্বাক্ষর তাকেই করতে হয়। মেশিন সুপারভাইজার চৌধুরী ইকবাল কবির (নিরাপত্তা অপারেটর) স্ক্রিনিং করার সময় এয়ারওয়ে বিলে উল্লিখিত পণ্য সঠিক আছে মর্মে জানান। ওই সময় শিফট ইনচার্জ ছিলেন নিরাপত্তা সুপারভাইজার রবিউল আলম।

সাদা মোড়কের ওই ১০ কার্টনের সঙ্গে স্ক্রিনিংকৃত একই রকমের অতিরিক্ত ৫ কার্টন-বস্তা ওয়্যারহাউস বিল্ডআপ এরিয়ার আড়ালে নিয়ে নিরাপত্তা সিল খুলে ওয়্যারহাউস এরিয়ায় রক্ষিত এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটের ২৭ কার্টন পণ্যের মধ্য থেকে ১০ কার্টন সরিয়ে বাকি ১৭ কার্টনের সঙ্গে নিরাপত্তা সিল খোলা ১০ কার্টন মিশিয়ে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের কনটেইনারে লোড করা হয়। নিরাপত্তা সিল ও ডিক্লারেশন ছাড়া আইটেম বহন করা মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের চরম দায়িত্বে অবহেলা। এ ছাড়া ভুলভাবে স্ক্রিনিং করে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির ঘটনাও নিয়মিত ঘটে বলে উঠে আসে প্রতিবেদনে।

কমিটির তদন্তে উঠে আসে, এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটের ২৭ কার্টন পণ্য ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ৬ নম্বর স্ক্যানিং মেশিনে স্ক্রিনিং করা হয়। এতে সাসপেকটেড পণ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই তারিখে হংকংগামী আরএইচ-৬৬৫২ ফ্লাইটে শিপার ‘বোমিনো এক্সপ্রেস সার্ভিসের’ এয়ারওয়ে বিল নং-৮৫১-৪২২২-৯৪১২-এর ১০ কার্টন পণ্য ৪ নম্বর মেশিনে স্ক্রিনিং করা হয়।

বিমানের সিসিটিভি ফুটেজ ও ওই মেশিনের সংরক্ষিত স্ক্রিনিং ইমেজ স্ক্রিনারদের দ্বারা পরীক্ষা করে ওই ইমেজের মধ্যে ডিক্লারেশন ব্যতীত সাসপেকটেড পণ্যের অস্তিত্ব রয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। সাদা মোড়কে আচ্ছাদিত ১০ কার্টন পণ্যের ডিক্লারেশন থাকলেও স্ক্রিনিংয়ের পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণে একই রকমের ১৫টি বস্তা-কার্টন পরিলক্ষিত হয়। এই ১৫ বস্তা-কার্টনের মধ্য থেকে ১০টি আরএইচ-৬৬৫২ ফ্লাইটে হংকং পৌঁছায়। বাকি ৫ বস্তা-কার্টন কার্গো ওয়্যারহাউস বিল্ডআপ এরিয়ায় আগে থেকে সংরক্ষিত কার্টনের আড়ালে নিয়ে নিরাপত্তা সিল খুলে ৫ বস্তা থেকে ১০ কার্টন পণ্য বের করে এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটে লোড করার জন্য রক্ষিত কার্টনের সঙ্গে মিক্স করে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের কনটেইনারের মধ্যে রাখা হয়। যা পরে এ ফ্লাইটে লোড করা হয়। এ ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত। এখানে বিমান ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের দায়িত্বে অবহেলা প্রতীয়মান। সুকৌশলে যোগসাজসে কাজটি করা হয়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ