শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

সমুদ্র দ্বীপে প্রবালের ছোঁয়ায় সেন্টমার্টিন

 

রিদুয়ানুল হক সোহাগ, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে:

বাংলাদেশের মানচিত্রের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যা মূলভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলায় টেকনাফ উপজেলার বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা একমাত্র ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন।
স্থানীয় ভাষায় সেন্টমার্টিনকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলেও ডাকা হয়। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত এ দ্বীপটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে।

দক্ষিণের স্বর্গ’ নীল আকাশের সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী,খোলা-মেলা বালুকাময় সমুদ্র সৈকত আর সমুদ্রের বিরামহীন গর্জন যেন নীল রঙের রাজ্যে পরিণত করেছে,সারি সারি নারিকেল গাছ,ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলা গাঙচিল। সৈকতে বসে স্নিগ্ধ বাতাসে গা জুড়িয়ে নেওয়া, কেয়া বন আর সাগরলতার মায়াময় স্নিগ্ধতায় মন জুড়িয়ে যায় নিমিষেই।

এ দ্বীপকে করেছে অন্যতম সৌন্দর্য, ভ্রমণ মৌসুমে পর্যটকদের ঢল নামে ছোট্ট এই প্রবাল দ্বীপে৷ ভ্রমণের পরম আরাধ্য একটি পর্যটন গন্তব্য হচ্ছে সমুদ্র দ্বীপে প্রবালের ছোঁয়ায় সেন্টমার্টিন। প্রতিবেশ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রবাল। সাগরের ছোট-বড়, মেরুদণ্ডী-অমেরুদণ্ডূ অধিকাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদকে আগলে রাখে এসব প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ।

ভাটায় জেগে ওঠা নান্দনিক প্রবাল প্রাচীর, উড়ে চলা গাঙচিল, পশ্চিম বিচ থেকে দেখা সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য, স্নিগ্ধ বাতাস আর সাগরের স্বচ্ছ নীল জলে দল বেঁধে বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার লোভে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে লাখ লাখ পর্যটক পদচিহ্ন আঁকেন এ দ্বীপে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে।

দ্বীপে জীবন-জীবিকা মাছ ধরা, শুটকি প্রকৃয়াকরণ, সামান্য চাষাবাদ ও পর্যটন সেবার ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে (অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত) দ্বীপটি কর্মচঞ্চল থাকে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের মানুষ নিতান্ত সহজ-সরল, তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।

মূল দ্বীপের সঙ্গে ছেঁড়া দ্বীপের সংযোগস্থল (স্থানীয়ভাবে গলাচিপা নামে পরিচিত) সামান্য নিচু হওয়ায় জোয়ারের সময় এটি তলিয়ে যায়। তাই ভাটার সময় হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া গেলেও জোয়ারের সময় নৌকা নিয়ে যেতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় উত্তর প্রান্ত থেকে পশ্চিম বিচ ধরে সাইক্লিং করে বা সম্পূর্ণ পথ পায়ে হেঁটে গেলে। নির্জন এই পথটা অসম্ভব সুন্দর।

সেন্টমার্টিন দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি প্রধানত সমতল। তবে কিছু কিছু বালিয়াড়ি দেখা যায়। দ্বীপ ও দ্বীপসংলগ্ন সমুদ্র মিলিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যাও অনেক।

প্রবাল দ্বীপে শৈবাল সম্ভাবনা ‘সামুদ্রিক শৈবাল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ। স্থানীয়ভাবে ‘পেজালা’ নামে পরিচিত এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্টমার্টিনে প্রচুর পাওয়া যায়।

সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপে নানান প্রজাতির প্রবাল শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল, গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া,নারিকেল গাছসহ নানাধরণের উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে।

বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক কবি হুমায়ুন আহমেদ এর সমুদ্র বিলাস নামের ছোট্ট কুঠির টি নজর কাড়ে সকল পর্যটকদের। এ যেন হুমায়ুন আহমেদের রেখে যাওয়া এক অনবদ্য সৃষ্টি

কীভাবে যাবেন: পর্যটন মৌসুমে (অক্টোবর থেকে মার্চ মাস) কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে যাত্রী পারাপারে জন্য বেশ কয়েকটি জাহাজ চালু থাকে। এগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী, কেয়ারি সিন্দাবাদ, কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, আটলান্টিক, বে ক্রুজ, গ্রিন লাইন উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এই সমুদ্র রুটে বেশ কিছু ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে।

জাহাজে করে কক্সবাজার থেকে সেন্টমর্টিন যেতে সময় লাগে ছয় থেকে সাত ঘন্টা ও টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। প্রতিদিন কক্সবাজার নুনিয়ার ছড়া BIWTA ঘাটে থেকে সকাল ৭টার দিকে ও টেকনাফ জেটি ঘাট থেকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জাহাজগুলো সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং সেন্টমার্টিন থেকে ফেরত আসে বিকেল ৩টার দিকে।

সেন্টমার্টিনের দুই ধরনের পর্যটক যায়: কেউ কেউ সেন্টমার্টিন এসে ঐদিনই ফিরে যায়। আবার কেউ কেউ রাত্রি যাপন করে। যারা দিনে এসে দিনই চলে যান তাদের দেখার সুযোগ খুব কম। কিন্তু যারা রাতে থাকেন তাদের জন্য রয়েছে অপার সুযোগ। আমরা কক্সবাজার অনলাইন প্রেসক্লাব রাত্রি যাপন করা পর্যটক ছিলাম। তাই আমাদের সব কিছু দেখার সুযোগ ছিল। ঘুরাঘুরি মধ্যে ছিল,সাইক্লিং,সমুদ্রস্নান, ফটোশেসন,নিল ও সাদা দলের ফুটবল ম্যাচ,রাফেল ড্র,আলোচনা,ক্রেষ্ট বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

কোথায় খাবেন: প্রবাল দ্বীপ পর্যটকদের খাবারের জন্য রয়েছে সৈকতের পাশে বেশ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁ। সন্ধ্যা বেলায় পথের দু’ধারে, হোটেল-রেস্তোরাঁর সামনে নানা রকম মাছ, কাঁকড়া, অক্টোপাস সাজিয়ে বসে দোকানিরা।তেলে ভাজা মাছের সুগন্ধে চারদিক মৌ মৌ করে। রাতে প্রায় সব হোটেলের আঙিনায় চলে মাছের বার্বিকিউ উৎসব।

কোথায় থাকবেন: সেন্টমার্টিনে পর্যটক থাকার জন্য বেশ কিছু উন্নতমানের হোটেল ও কটেজ রয়েছে। অনেক বাড়িতেও আছে পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা। নিজের সাধ্যমতো যেকোনো একটি বেছে নিতে পারে। তবে অবশ্যই ভাড়া আগে মিটিয়ে নিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ